Social Icons

twitterfacebookgoogle pluslinkedinrss feedemail
Showing posts with label Knowledge. Show all posts
Showing posts with label Knowledge. Show all posts

Saturday, August 09, 2014

ভক্তি কি?

lord_shivas_family

বিজ্ঞান হচ্ছে পরমতত্ত্ব। বিজ্ঞান হল সেই জ্ঞান যে জ্ঞানের উদয় হলে ‘আমি ব্রহ্ম’ এরূপ বিশ্বাসে মন দৃঢ় হয়। ব্রহ্ম ছাড়া আর অন্য কোন বস্তুর কথা মনেও আসে না এবং সেই বিজ্ঞানী মানুষের বুদ্ধি সর্বতোভাবে শুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই বিজ্ঞান দুর্লভ। জগতে সেই শুদ্ধ জ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কম। সেই বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানী যা এবং যেমন তা সর্বদাই শিব স্বরূপ সাক্ষাত পরাৎপর ব্রহ্ম।

কিন্তু সেই বিজ্ঞান লাভের পথ হল বিশুদ্ধ শিব ভক্তি। এই ভক্তিই হল ওই বিজ্ঞানের মাতৃ স্বরূপ যা ভোগ ও মোক্ষ রূপ ফল প্রদানকারী। আর বাবা মহাদেবের কৃপাতেই মানুষ সেই ভক্তি লাভ করতে পারে। ভক্তি ও জ্ঞানে কোন কোনও পার্থক্য নেই। ভক্ত ও জ্ঞানী উভয়েই সর্বদা সুখদায়ক হয়ে থাকেন। যিনি ভক্তির বিরোধী তাঁর জ্ঞান লাভ হয় না।

“ভক্তৌ জ্ঞানে ন ভেদো হি তৎকর্তুঃ সর্বদা সুখম্‌ ।

বিজ্ঞানং ন ভবত্যেব সতি ভক্তি বিরোধিনঃ ।।

ভক্তাধীনঃ সদাহং বৈ তৎ প্রভাবাদ্‌ গৃহেষ্বপি।

নীচানং জাতিহীনানাং যামি দেবি ন সংশয়ঃ ।।”(শিবপুরাণ রুদ্রসংহিতা)

মহাদেব মহেশ্বর সর্বদা ভক্তের অধীন থাকেন এবং ভক্তির প্রভাবে জাতি হীন নীচ মানুষদের গৃহেও তিনি অবস্থান করেন। গুণ ভেদে ভক্তি দুই রকম – সগুণা এবং নির্গুণা। যে ভক্তি শাস্ত্রবিধি দ্বারা প্রেরিত বা বৈধী অথবা হৃদয়ের সহজ অনুরাগ দ্বারা প্রেরিত বা স্বাভাবিক সেই ভক্তিই উচ্চকোটির ভক্তি। এছাড়া যে কামনামূলক ভক্তি হয়ে থাকে তা নিম্নকোটির ভক্তি। সগুণ এবং নির্গুণ ভক্তি আবার নৈষ্ঠিকী ও অনৈষ্ঠকী ভেদে দুই ভাগে বিভক্ত। নৈষ্ঠিকী ভক্তি ছয় প্রকারের এবং অনৈষ্ঠকী ভক্তি একই প্রকারের হয়। প্রকৃত বিদ্বান ব্যক্তি বিহিতা এবং অবিহিতা ভেদে নানা প্রকারের বলে মনে করে থাকেন। সগুণা এবং নির্গুণা উভয় ভক্তির নয়টি অঙ্গ।

“শ্রবণং কীর্তনং চৈব স্মরণং সেবনং তথা।

দাস্য তথার্চনং দেবি বন্দনং মম সর্বদা।।

সখ্যমাত্মার্পণং চেতি নবাঙ্গানি বিদুর্বুধাঃ।”- শিবপুরাণ রুদ্রসংহিতা

শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, সেবন, দাস্য, অর্চন, সর্বদা শিব বন্দনা, সখ্য এবং আত্মসমর্পণ। এছাড়াও ভক্তির বিভিন্ন উপাঙ্গও রয়েছে।

যে ব্যক্তি স্থির হয়ে সমগ্র মনকে শিবকেন্দ্রিক করে আসনে উপবেশন করে শরীর ও মনের দ্বারা শিবকথা শিব কীর্তনে শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করে প্রসণ্ণতাপূর্বক সেই অমৃত সমান কথা-কীর্তন রস পান করেন তার সেই সাধনাকে বলা হয়ে থাকে শ্রবণ।

যিনি তার হৃদাকাশে মহাদেব মহেশ্বরের দিব্য জন্ম-কর্ম-লীলা চিন্তা করে প্রেমভরে তা উদাত্তকণ্ঠে গীত করেন তার এই ভজন সাধনকে বলা হয় কীর্তন।

নিত্য মহাদেব পরমপুরুষ তৎপুরুষ মহেশ্বরকে সর্বদা ও সর্বত্র ব্যাপক (সকল বস্তুর মধ্যেই তিনি বিদ্যমান) জেনে যিনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সব সময়ে নির্ভয়ে থাকেন তার সেই ভক্তিকে বলা হয়ে থাকে স্মরণ।

অরুণোদয় থেকে শুরু করে সব সময়ে প্রভুর কৃপাকে বা তার অনুকূলতাকে মনে রেখে মন-বুদ্ধি-চিত্ত-হৃদয় এবং ইন্দ্রিয়াদির দ্বারা নিরন্তর মহেশ্বরের সেবা করা হয় তাকেই সেবন নামক ভক্তি বলা হয়।

নিজেকে প্রভুর সেবক মনে করে অন্তর থেকে সর্বদা প্রভূ ভোলানাথের প্রিয় সম্পাদন করাকে দাস্য বলা হয়।

নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী শাস্ত্রীয় বিধি দ্বারা পরমাত্মারূপী আমাকে সর্বদা পাদ্য-অর্ঘ্য ইত্যাদি ষোড়শোপচারে বা পুষ্প-গন্ধ ইত্যাদি পঞ্চোপচারে পূজন করাকেই অর্চন বলা হয়ে থাকে।

অন্তরে ধ্যান ও বাক্য দ্বারা স্তোত্র বন্দনামূলক মন্ত্রাদির পাঠ করতে করতে শরীরের আট অঙ্গে ভূমি স্পর্শ করে ইষ্টদেবকে নমস্কার করাকে বলা হয় বন্দন।

প্রাণেশ্বর মহাদেব মহেশ্বর মঙ্গল-অমঙ্গল যা কিছুই সংঘটিত করেন না কেন তা ভক্তের মঙ্গল সাধনের জন্য অন্তরের এই রকম দৃঢ় ভক্তিকে বলা হয়ে থাকে সখ্য।

দেহ ইত্যাদি যা কিছু বস্তু নিজের বলে মনে করা হয়, সেই সমস্ত কিছু ভগবানের প্রসন্নতার জন্য তাকে সর্ব সমর্পণ করে নিজের জন্য কিছুই না রাখাকে এমনকি শরীর নির্বাহের চিন্তা রহিত হওয়াকে বলে আত্মসমর্পণ।

শিবশক্তির এই হল নয়টি অঙ্গ। এই গুলি ভোগ ও মোক্ষ প্রদানকারী। এর দ্বারা জ্ঞান প্রকাশিত হয় এবং ভক্ত বিজ্ঞানী হয়ে ওঠে।

Sunday, December 22, 2013

ইতি মোহ-মুদ্গর


শত্রৌ মিত্রে পুত্রে বন্ধৌ মাকুরু যত্নং বিগ্রহসন্ধৌ।
ভব সমচিত্তঃ সর্ব্বত্র ত্বং বাঞ্ছস্যচিরাদ্‌ যদি বিষ্ণুত্বং।।৯।।
শত্রু-মিত্র পুত্র-বন্ধু বান্ধব আদি যা কিছু সম্পর্ক আছে এদের সাথে এবং ঝগড়া সন্ধি ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষ যত্ন করার কোন দরকার নেই। ভগবান চারিপাশে ব্যাপ্ত আছেন এই কথাটি মনে রেখে সকলের প্রতি সমান যত্ন নেওয়ার চেষ্টা সব সময়েই করা উচিত।
অষ্টকুলাচলসপ্তসমুদ্রাঃ ব্রহ্মাপুরন্দরদিনকররুদ্রাঃ।
ন ত্বং নাহং নায়ং লোকঃ তদপি কিমর্থং ক্রিয়তে শোকঃ।।১০।।
এই মহাদেশ সসাগরা জগৎ সংসার ব্রহ্মা (সৃষ্টি কর্তা), ইন্দ্র (ভোগ কর্তা), সূর্য্য (পালন কর্তা), রুদ্র (সংহার কর্তা) কতৃক পরিচালিত হয়। তুমি-আমি এই লোক সমূহে ক্ষণ ভঙ্গুর পদার্থ মাত্র। তাহলে কিসের জন্য তুমি দুখঃ শোকে জর্জরিত হয়ে থাকো!
ত্বয়ি ময়ি চান্যত্রৈকোবিষ্ণুঃ ব্যর্থং কুপ্যসি ময্যসহিষ্ণুঃ।
সর্ব্বং পশ্য আত্মনাত্মানং সর্ব্বতোৎসৃজ ভেদজ্ঞানম্‌।।১১।।
তুমি আমি আর কেউ নই আমরা সেই এক সর্ব্বঘটে পরিব্যাপ্ত ব্যাপ্তময় বিষ্ণু এর জন্য ব্যর্থই আমার প্রতি অসিহষ্ণুতা বশত রাগ করে থাকো। চেয়ে দেখ চারিদিকে যা কিছু দেখতে পাচ্ছ সব তোমারই আত্মারই অংশ, আত্মার আত্মীয়। সুতারং যত্ন সহকারে মন থেকে এই ভেদজ্ঞান দূর করে দাও।
বালস্তাবৎ ক্রীড়াসক্ত-স্তরুণস্তাবৎ তরুনীরক্তঃ।
বৃদ্ধস্তাবচ্চিন্তামগ্নঃ পরমে ব্রহ্মণি কোহপি ন লগ্নঃ।।১২।।
বালকেরা যেরকম খেলার প্রতি আসক্ত, তরুনরা যেরকম তরুনীদের প্রতি আসক্ত, বৃদ্ধেরা যে রকম বিষয় চিন্তার প্রতি আসক্ত থাকে, পরম ব্রহ্মেকে জানার জন্য সেই রকম আকুল করা আসক্তি দেখ কারো মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
অর্থমনর্থং ভাবয় নিত্যং নাস্তি ততঃ সুখলেশঃ সত্যং।
পুত্রাদপি ধনভাজাং ভীতিঃ সর্ব্বত্রৈষা কথিতা নীতিঃ।।১৩।।
অনর্থকারী অর্থ চিন্তায় সব সময়ে ডুবে আছো কিন্তু জেনে রাখো তাতে লেশ মাত্র সত্যিকারের সুখ নেই। হে ধনী, সংসারের লোকেরা এমনকী নিজের সন্তানরাও তোমাকে যে শ্রদ্ধা ভক্তি প্রদর্শন করে তা তোমার ধন প্রাপ্ত করার জন্য। সব সময় এমনি হয়ে থাকে নীতিকথাতে তাই বলা আছে।
যাবদ্বিত্তোপার্জ্জনশক্তঃ তাবন্নিজপরিবারো রক্তঃ।
তদনু চ জরয়া জর্জ্জরদেহে বার্ত্তাং কোহপি ন পৃচ্ছতি গেহে।।১৪।।
যতদিন তুমি অর্থ উপার্জন করতে পারবে ততদিন তোমার পরিবারের সকলে তোমার খুব অনুরক্ত থাকবে। তুমি যা বলবে তাই হবে, তোমার কথায় সবাই ওঠা বসা করবে। তারপরে যখন সময়ের চক্রে জরা ব্যাধি ইত্যাদি এসে তোমার দেহে বাসা বাধবে, নড়বড়ে হয়ে তুমি বিছানায় শুয়ে থাকবে, তোমার বাড়িতেই তোমারই পরিবারের কেউ আর তোমার কথা জিজ্ঞেস করবে না, তোমার সাথে কথা বলবে না, তোমার সঞ্চিত অর্থের দ্বারা কোন সেবাদাসী নিয়োজিত হয়ে তোমার সামনে বসে খবরের কাগজ পড়বে।
কামং ক্রোধং লোভং মোহং ত্যক্ত্বাত্মানং পশ্যতি কোহহং।
আত্মজ্ঞানবিহিনা মূঢ়া স্তে পচ্যন্তে নরকে নিগূঢ়াঃ।।১৫।।
কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহ চেষ্টা করে পরিত্যাগ কর। নিজের আত্মাকে জানার চেষ্টা কর, তুমি কে? এই আত্মজ্ঞান না হলে তুমি মূর্খই রয়ে যাবে। এই জীবন-মৃত্যু ময় সংসারে জন্ম জন্মান্তর ধরে পচতে হবে।
ষোড়শপজ্ঝটিকাভিরশেষঃ শিষ্যানাং কথিতোহভ্যুপদেশঃ।
যেষাং নৈব করোতি বিবেকং তেষাং কঃ কুরুতে মতিরেকং।।১৬।।
এই ঝাড়া ষোলটি পদের দ্বারা শিষ্যদের সবাইকে আমি উপদেশ প্রদান করলাম। কিন্তু এতেও যার বিবেক জাগ্রত হয় না তার সেই এক পরব্রহ্মে মতি কিভাবে হবে?

-ইতি মোহ-মুদ্গর সম্পূর্ণ। 

Saturday, December 14, 2013

আত্মজ্ঞান নির্ণয় (ভাগ-শেষ)


বহিরন্ত যর্থাকাশং  সর্ব্বেষামেব বস্তুতঃ।
তথৈব ভাতি সদ্রূপো হ্যত্মা সাক্ষী স্বরূপতঃ।।২১।।
সকল বস্তুর মধ্যে আকাশ যেভাবে ভিতরে ও বাইরে অবস্থিতি করে বস্তু সমূহের আধার স্বরূপ অবস্থান করে, সেই ভাবে আত্মাও সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ভিতরে ও বাইরে অবস্থিত হয়ে সাক্ষী স্বরূপ বিরাজিত থাকেন।
ন বাল্যং নাপি বৃদ্ধত্বং নাত্মনো যৌবনং জনু।
সদৈকরূপশ্চিন্মাত্রো বিকারপরিবর্জ্জিতঃ।।২২।।
আত্মার শৈশব, যৌবন ও বার্দ্ধক্য কোন কিছুই নাই। সেই আত্মা সব সময় এক এবং চিন্মাত্র। আত্মার কোন বিকারও নেই। বাল্য-যৌবন-বার্দ্ধক্য শরীরের অবস্থা কিন্তু আত্মা এই শরীরের মধ্যে অবস্থিত হয়েও শরীরের এই বিকার থেকে সর্বদাই মুক্ত থাকে।
জন্মযৌবনবার্দ্ধক্যং দেহেস্যৈব নচাত্মনঃ।
পশ্যন্তহোপি ন পশ্যন্তি মায়াপ্রাবৃতবুদ্ধয়ঃ।।২৩।।
জন্ম, যৌবন ও বার্দ্ধক্য দেহেরই এক একটি অবস্থামাত্র আত্মার নয়। যাদের বুদ্ধি মায়ার আবরণে মোড়া তারা এটা দেখেও দেখতে পান না বা বুঝতে পারেন না।
যথা শরাবতোয়স্থং রবিং পশ্যন্ত্যনেকধা।
তথৈব মায়য়া দেহে বহুধাত্মানমীক্ষতে।।২৪।।
যেভাবে অনেক গুলি জল পূর্ন পাত্রের মধ্যে সূর্য কে প্রতিফলিত দেখে আমরা ভাবি প্রত্যেক পাত্রের মধ্যেই বুঝি এক এক সূর্য্য আছে, সেই রকম বিভিন্ন দেহে সেই আত্মার প্রকাশ কে দেখে আমরা মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে ভাবি সেই এক আত্মা বুঝি অনেক।
যথা সলিলচাঞ্চল্যং মন্যতে তদগতে বিধৌ।
তথৈব বুদ্ধেশ্চাঞ্চল্যং পশ্যন্ত্যাত্মন্যকোবিদা।।২৫।।
জলরাশি আন্দোলিত হলে তার উপর প্রতিফলিত হওয়া চাঁদের ছায়া যে রকম আন্দোলিত হয় সেই রকম অজ্ঞব্যক্তি বুদ্ধির চাঞ্চল্য হলে আত্মাকেও সেই রকম চাঞ্চল্যপূর্ণ ভেবে থাকে।
ঘটস্থং যাদৃশং ব্যোম ঘটে ভগ্নেহপি তাদৃশং।
নষ্টে দেহে তথৈবাত্মা সমরূপো বিরাজতে।।২৬।।
একটা মাটির হাঁড়ির মধ্যে যে শুন্যস্থান থাকে তা ওই ঘট ভেঙে দিলে যে রকম শুন্য হয়েই অবিচল থাকে সেই রকম দেহের মধ্যেকার আত্মা দেহের বিনাশের পর সেই একই রকম থাকে তার কোন রকম ধ্বংস হয় না।
আত্মজ্ঞানমিদং দেবি পরং মৌক্ষৈকসাধনং।
জানন্নিহৈব মুক্তঃ স্যাৎ সত্যং সত্যং ন সংশয়ঃ।।২৭।।
হে দেবী আমি তোমাকে তিন সত্যি করে বলছি, আত্মজ্ঞানই একমাত্র পরম মোক্ষসাধন। যিনি এই আত্মাকে জানতে পারেন তিনি সাথে সাথেই মুক্তি লাভ করবেন এতে কোন সংশয় নেই।
ন কর্ম্মণা বিমুক্তোঃস্যান্ন মন্ত্রারাধনেন বা।
আত্মনাত্মানং বিজ্ঞায় মুক্তো ভবতি মানবঃ।।২৮।।
মানব তার কর্ম্মের দ্বারা বা মন্ত্র আরাধনার দ্বারা মুক্তি লাভ করতে পারে না। স্বীয় আত্ম র মধ্যে অবস্থিত আত্মা কে বিশেষ ভাবে জানলেই মানবের মুক্তি ঘটে থাকে।
প্রিয়োহ্যাত্বৈব সর্ব্বেষাং নাত্মনোহস্ত্যপরং প্রিয়ং।
লোকেহস্মিন্নাত্মসম্বন্ধাদ্ভবন্ত্যন্যে প্রিয়াঃ শিবে।।২৯।।
হে শিব প্রিয়ে, আত্মাই জীবসকলের পরম প্রিয়, আত্মা ছাড়া আর কিছুই প্রিয়বস্তু নেই। কিন্তু সময়ে সময়ে লোকেরা যে বিভিন্ন বস্তুকে প্রিয় বলে মনে করে থাকে তার কারন, সেই সেই বস্তু গুলির সাথে আত্মার কিছু না কিছু বিশেষ সম্বন্ধ যোগ থাকে।
জ্ঞানং জ্ঞেয়ং তথা জ্ঞাতা ত্রিতয়ং ভাতি মায়য়া।
বিচার্য্য আত্মত্রিতয়ে আত্মৈবৈকোহবশিষ্যতে।।৩০।।
এই ব্রহ্মাণ্ড মায়ার প্রভাবে জ্ঞান(যা জানা হয়), জ্ঞেয় (যাকে জানা হয়)ও জ্ঞাতা (যিনি জেনেছেন)এই তিন প্রকারে প্রকাশিত। জ্ঞান-জ্ঞেয়-জ্ঞাতা এই তিন প্রকাশিত ব্রহ্মাণ্ডদ্বারা আত্মবিচার করলে সেই অদ্বিতীয় পরমাত্মাকে অবশেষে জানা যায়, অবশেষ রূপে জানা যায়। যতক্ষন পর্যন্ত না মানুষের তত্ত্বজ্ঞান না হয় ততক্ষন চোখ,কান, নাক, জিভ, ত্বক ও মনকে, জ্ঞান, শব্দ, রূপ ও রসাদি সমুদয়কে জ্ঞেয় এবং নিজেকে জ্ঞাতা বলে তারা মনে করেন। কিন্তু যখন তার তত্বজ্ঞান হয়ে যায় তখন সে এই ব্রহ্মাণ্ডের সকল বস্তুর রূপ-নাম ইত্যাদি পরিত্যাগ করে ঐ জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা এই তিন ভিন্ন পদার্থকে সেই এক ও অখণ্ড পরমাত্মা বলে বিশেষ ভাবে অবগত হতে পারে।
জ্ঞানমাত্মৈব চিদ্রূপো জ্ঞেয় স্তাত্মৈব চিন্ময়ং।
বিজ্ঞাতা স্বয়মেবাত্মা যো জানাতি স আত্মবিৎ।।৩১।।
আত্মজ্ঞানের দ্বারা সেই চিদরূপী আত্মাকে জ্ঞানরূপে, সেই চিন্ময় আত্মাকে জ্ঞেয় রূপে, এবং আপন অন্তর স্থিত আত্মাকে জ্ঞানীরূপে যিনি জানতে পারেন তিনিই আত্মদর্শী। জ্ঞান-জ্ঞেয়-জ্ঞাতা এই তিনি পদার্থকেই যিনি আপন চিদাত্মারূপে জানেন তিনিই আত্মজ্ঞানী।
এতত্তে কথিতং জ্ঞানং সাক্ষান্নির্ব্বাণকারণং।
চতুর্ব্বিধাবধুতানামেতদেব পরমং ধনম্‌।।৩২।।
হে দেবী, সাক্ষাৎ নির্ব্বাণ(মুক্তির) কারণ স্বরূপ যে আত্মজ্ঞান এতক্ষন আমি তোমাকে বললাম, তা চার প্রকার অবধূতদের মহাধন বলে জানবে।

-ইতি আত্মজ্ঞান নির্ণয়।

Friday, December 13, 2013

আত্মজ্ঞান নির্ণয় (ভাগ-২)


মৃৎশিলাধাতুদর্ব্বাদিমূর্ত্তাবীশ্বরবুদ্ধয়ঃ।
ক্লিশ্যন্ত স্তপসা জ্ঞানং বিনা মোক্ষং ন যান্তি তে।।১১।
মাটি, পাথর, ধাতু ও কাঠ ইত্যাদি দ্বারা নির্মিত ঈশ্বরের মূর্ত্তিকে ভগবান জ্ঞানে তপস্যা করে করে হাজার ক্লেশ সহ্য করলেও যদি ব্যাক্তির তত্ত্বজ্ঞান না জন্মায় তাহলে তার মুক্তি সম্ভব হয় না।
অহো রসসমাহৃষ্টা যথেষ্টাহার-তণ্ডুলাঃ।
ব্রহ্মজ্ঞানবিহীনাশ্চেৎ নিষ্কৃতিস্তে ব্রজন্তি কিম্‌।।১২।।
নানা ধরনের রস ভোগ করে হৃষ্ট, নানা ধরনের শস্যকে আহার করে পুষ্ট দেহ লাভ করা যায় কিন্তু যারা ব্রহ্মজ্ঞান বিহীন তারা কি করে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারে!
বায়ুপর্ণকণাতোয়প্রাশিনো মোক্ষভাগিনঃ।
সন্তি চেৎ পন্নগা মুক্তাঃ পশুপক্ষি-জলচরাঃ।।১৩।।
বাতাস, গাছের পাতা, শস্যকণা ও জল ইত্যাদি দ্রব্য গ্রহণ করলেই যদি মোক্ষপ্রাপ্তির যোগ্য হওয়া যেত তাহলে পশু,পক্ষী, জলচরজীব ইত্যাদি প্রানীগণও নিশ্চয় মুক্ত হয়ে যেত যেহেতু তারাও ওই সব জিনিস আহার হিসাবে গ্রহণ করে থাকে।
উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবস্তু মধ্যমঃ।
স্তুতির্জপোহধমো ভাবো বাহ্যপূজাধমাধমা।।১৪।।
জীবগণের পক্ষে একমাত্র ব্রহ্ম সদ্ভাব উত্তম। ধ্যানভাব মধ্যম, স্তুতি-জপ ভাব ইত্যাদি অধম এবং বাহ্যপূজাভাব একেবারেই অধমের থেকেও অধম।
যোগো জীবাত্মনোরৈকং পূজনং শিবকেশবে।
সর্ব্বং ব্রহ্মেতি বিদুষো ন যোগো ন চ পূজনম্‌।।১৫।।
জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার যে একতা তার উপলব্ধিই যোগ। শিব এবং বিষ্ণুর যে উপাসনা মনে মনে অহরহ করা যায় তাইই একমাত্র পূজা। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান, আবিষ্কৃত-অনাবিষ্কৃত সকল পদার্থের মধ্যে সেই এক ও অভিন্ন পরমব্রহ্মকে যিনি উপলব্ধি করতে পারেন তার আর যোগেরও দরকার থাকে না, পূজারও দরকার থাকে না।
ব্রহ্মজ্ঞানং পরং জ্ঞানং যস্য চিত্তে বিরাজতে।
কিন্তস্য জপযজ্ঞাদ্যৈস্তপোভির্নিয়মব্রতৈঃ।।১৬।।
ব্রহ্মজ্ঞানই পরম জ্ঞান – যার চিত্তের মধ্যে সর্বদাই ব্রহ্মজ্ঞান বিরাজ করে তার জপ, যজ্ঞ, তপ, ব্রতপালন ইত্যাদি নিয়মের কি প্রয়োজন !
সত্যং বিজ্ঞানমানন্দমেকং ব্রহ্মেতি পশ্যতঃ।
স্বভাবাদ্ব্রহ্মভূতস্য কিং পূজাধ্যনধারণাঃ।।১৭।।
সত্য, বিজ্ঞান ও আনন্দময় দৃষ্টি সহকারে যিনি সর্বদা সর্বভূতে সেই পরমব্রহ্মকে দেখতে পান, সেই স্বভাবতঃ ব্রহ্মভাবময় ব্যাক্তির পূজা, ধ্যান, ধরনা আর কি হতে পারে!
ন পাপং নৈব সুকৃতং ন স্বর্গো ন পুনর্ভবঃ।
নাপি ধ্যেয়ো ন বা ধ্যাতা সর্ব্বং ব্রহ্মেতি জ্ঞানতঃ।।১৮।।
ব্রহ্ম সর্ব্বময় এই জ্ঞান যার হয়েছে তার আর পাপ-পুন্য, স্বর্গ-নরক, ধ্যাতা-ধ্যেয় এসব কিছুই থাকে না।
অয়মাত্মা সদা মুক্তো নির্লিপ্তঃ সর্ব্ববস্তুষু।
কিন্তস্য বন্ধনং কর্ম্মান্মুক্তিমিচ্ছন্তি দুর্ধিয়ঃ।।১৯।।
আত্মাকে ভগবান ব্যাখা করেছেন সদা মুক্ত বলে। পদ্মপাতার উপর জল যেমন সেই পাতার উপর থেকেও তাতে লিপ্ত হয় না তেমনই আত্মা এই দেহের মধ্যে থেকেও সংসারের কোন বস্তুতেই লিপ্ত হয় না। তাহলে কেন মূর্খের মত এই আত্মার মুক্তি লাভের জন্য কোন বন্ধন থেকে তাকে মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, সে তো সদামুক্ত তার আবার বন্ধন কি!
স্বমায়ারচিতং বিশ্বমবিতর্কং সুরৈরপি।
স্বয়ং বিরাজতে তত্র পরমাত্মাহ্যপ্রবিষ্টবৎ।।২০।।
পরমাত্মা নিজের মায়া দ্বারা সৃষ্ট এই বিশ্বসংসারে নিজে প্রবেশ না করেই প্রবেশিত ভাবে বিরাজ করছেন –দেবতারাও এই বিষয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ রাখেন না।(continue..)

Tuesday, December 10, 2013

আত্মজ্ঞান নির্ণয় (ভাগ-১)


যাবন্ন ক্ষীয়তে কর্ম্ম শুভঞ্চাশুভজেন বা।
তাবন্নাজায়তে মোক্ষো নৃণাং কল্পশতৈরপি।।১।।
মানুষের যতক্ষণ পর্যন্ত শুভাশুভ ফল ভোগী কর্ম লয় প্রাপ্ত না হয় ততদিন শত কল্প বিগত হলেও মানুষের মোক্ষ লাভ হয় না। কারণ মানুষ যতক্ষণ না তার সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করে বা কর্মের কর্তা হিসাবে নিজেকে ফলাফল ভোগী মনে করবে সেই কর্ম ফল মানুষকে মুক্ত হতে দেয় না এবং বারে বারে তাকে এই জীবন চক্রের পীড়া সহ্য করতে হবে। তাই নানা জায়গায় ভগবান বারে বারে বলেছেন কর্ম করে যাও এবং কর্মের কর্তা হিসাবে ভগবান কে মনে কর। তাহলে কর্ম ফল সেই মহান কর্তার উপরে বর্তাবে এবং জীব পাপ পুণ্য বিরহিত হয়ে সেই অমৃত লোকের সন্ধান পাবে।
যথা লৌহময়ৈঃ পাশৈঃ পাশৈঃ স্বর্ণময়ৈরপি।
তাবদ্বদ্ধো ভবেজ্জীবঃ কর্ম্মভিশ্চ শুভাশুভৈঃ।।২।।
শৃঙ্খল সে লোহার হোক বা সোনার হোক তা কেবল বেঁধে রাখতেই কাজে লাগে সেই রকম কর্মফল শুভ হোক বা অশুভ তা জীবকে বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। তাই জীব যতক্ষণ না তার সমস্ত কর্ম সেই মহান শিব চরণে অর্পিত করে ততক্ষণ তার কর্ম বন্ধন হতে মুক্তি লাভ হয় না।
কুর্ব্বাণঃ সততং কর্ম্ম কৃত্বা কষ্টশতান্যপি।
তাবন্ন লভতে মোক্ষং যাবৎ জ্ঞানং ন জায়তে।।৩।।
শত কষ্ট সহ্য করেও যদি সর্বদা কর্মে রত থাকা যায় তবুও মোক্ষ লাভ হয় না যতক্ষণ না জীবের আত্ম জ্ঞান হয়। যাগ-যজ্ঞ, জপ-তপ, ব্রত-উপবাস ইত্যাদি কর্ম মানুষ অনেক কষ্ট সহ্য করে করে থাকে। কিন্তু মানুষের মধ্যে যতক্ষণ না পূর্ণ জ্ঞানের প্রকাশ হয় ততক্ষণ এই সমস্ত কর্মের দ্বারা সে মোক্ষ লাভ করাতে পারে না। তাই মানুষের উচিত সর্ব প্রকারে সেই চেষ্টা করা যাতে মানুষের আত্ম জ্ঞান লাভ হয়ে থাকে।
জ্ঞানং তত্ত্ববিচারেণ নিষ্কামেনাপি কর্ম্মণা।
জায়তে ক্ষীনতমসাং বিদুষাং নির্ম্মলাত্মনাম্‌।।৪।।
জ্ঞানের দ্বারা তত্ত্ব সমূহকে বিচার করে ও নিষ্কাম ভাবে সকল কর্ম সম্পাদন করলে মনের অন্ধকার নাশ হতে থাকে এবং জীব বিদ্বান ও নির্ম্মলাত্মা হয়ে ওঠে। মানুষ জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হতে থাকে।
ব্রহ্মাদিতৃণপর্য্যন্তং মায়য়া কল্পিতং জগৎ।
সত্যমেকং পরং ব্রহ্ম বিদিত্বৈবং সুখী ভবেৎ।।৫।।
ব্রহ্মাদি দেবতা থেকে সামান্য ঘাস অবধি সকল পদার্থে পূর্ণ এই জগত হল মায়া দ্বারা কল্পিত। তাই যিনি সেই একমাত্র সত্য পরম পুরুষ কে জানতে পারেন তিনিই প্রকৃত সুখী হতে পারেন।
বিহায় নামরূপাণি নিত্যে ব্রহ্মণি নিশ্চলে।
পরিনিশ্চিততত্ত্বো যঃ স মুক্তঃ কর্ম্মবন্ধনাৎ।।৬।।
নাম এবং রূপ পরিত্যাগ করে যিনি সেই নিত্য নিশ্চল ব্রহ্মকে তত্ব সহকারে জেনেছেন তিনি নিশ্চয় এই শুভাশুভ কর্ম বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছেন। এই দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান জগত কে আমরা নির্দিষ্ট নাম এবং আকার অনুযায়ী জেনে থাকি, কিন্তু যিনি এই সমস্ত জগতে একমাত্র সেই পরম পুরুষ কে দেখতে পান তিনি যথার্থ জ্ঞানী হওয়ার জন্য তিনি মুক্ত।
ন মুক্তির্জপনাদ্ধোমাদুপবাসশতৈরপি।
ব্রহ্মৈবাহমিতি জ্ঞাত্বা মুক্তো ভবতি দেহভৃৎ।।৭।।
জপ, হোম ও শত শত উপবাস করলেও জীব মুক্তি লাভ করে না। কিন্তু সেই ব্রহ্মকে নিজের স্বরূপ হিসাবে দেখতে পেলেই এই দেহ ধারণ করেই মোক্ষ লাভ হয়ে থাকে। সেই পরম পুরুষ যদি সর্ব ব্যাপক হয়ে থাকেন তাহলে আমার মধ্যেও নিশ্চয় তিনি আছেন, তাই আমার মধ্যে তাকে যখন আমি আবিষ্কার করে থাকি তখন আমার স্বরূপ উপলব্ধি হয়ে থাকে। আর এই উপলব্ধি বিশেষ জ্ঞানের উৎপত্তিস্থল এবং এই বিশেষ জ্ঞান হয়ে থাকলেই জীব সমদর্শী হয়ে মুক্তি লাভ করে থাকে।
আত্মা সাক্ষী বিভু: পূর্ণ: সত্যেহদ্বৈতঃ পরাৎপরঃ।
দেহস্থোহপি ন দেহস্থো জ্ঞাত্বৈবং মুক্তিভাগ্‌ভবেৎ।।৮।।
আত্মা কে জাগ্রত, নিদ্রিত ও সুষুপ্ত এই তিন অবস্থার সাক্ষীস্বরূপ, সর্বব্যাপী ষড়ৈশ্বর্য্যপূর্ণ, সত্য, অদ্বৈত, পরাৎপর অথচ এই দেহস্থ হয়েও দেহস্থ নয় এইভাবে যিনি জেনেছেন তিনি মোক্ষলাভ করে থাকেন।
বালক্রীড়ানকং সর্ব্বং রূপনামাদিকল্পনাম্‌।
বিহায় ব্রহ্মনিষ্ঠো যঃ স মুক্তো নাত্র সংশয়ঃ।।৯।।
বাচ্চাদের খেলনার মত যিনি এই মায়াকল্পিত নাম রূপ ইত্যাদি পার্থিব সামগ্রিকে পরিত্যাগ করে কেবল মাত্র ব্রহ্মনিষ্ঠ হয়ে থাকেন তিনি যে সদা মুক্ত তাতে কোণ সন্দেহ নেই। বাচ্চারা যেমন খেলনা নিয়ে খেলার সময় এই পুতুল কে বাবা, ওই পুতুল কে কাকা, মাসী পিসি ইত্যাদি মনে করে খেলে এবং খেলা শেষ হলে সেই পুতুল গুলিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে চলে যায় এবং সেই পুতুলগুলির কথা তার মনেই আসে না তেমনি যে জ্ঞানী ব্যাক্তি নাম এবং রূপ সর্বস্ব এই সংসারের মায়া কাটিয়ে সেই পরম পুরুষ শিবের ধ্যানে নিমগ্ন থাকতে পারেন তিনিই মুক্ত।
মনসা কল্পিতা মূর্ত্তি নৃণাঞ্চেন্মোক্ষসাধনী।
স্বপ্নলব্ধেন রাজ্যেন রাজানো মানবো স্তদা।।১০।।

মনের দ্বারা কল্পিত দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি যদি জীবকে মোক্ষদান করতে পারতো তাহলে স্বপ্নে মানুষ যে নিজেকে রাজা উজির হতে দেখে তার ফলে সে রাজা হতে পারে না কেন?  মানুষ কল্পিত আকার বিশিষ্ট দেব-দেবীর উপাসনাতে মানুষের চিত্তশুদ্ধি হতে পারে সত্য কিন্তু তার দ্বারা মুক্তিলাভের আশা করা যায় না। (continue...)

Monday, December 09, 2013

শিব-গীতা

শিব-গীতা

প্রথম অধ্যায়

প্রথমে প্রনতি জানাই দেব নারায়ণে।

জয় দেবি সরস্বতি মতি শিব জ্ঞানে।।

কহিলেন সূত সব ঋষিগন প্রতি।

গীতা শাস্ত্র অধ্যয়ন মুক্তিদায়ী অতি।।

মহেশের অনুগ্রহে করিনু ব্যাখ্যান।

মহাদুখঃ তরিবার শিব উপাখ্যান।।

বেদকর্ম, দান, তপ যত করা যায়।

মানব কৈবল্যপদ কভু নাহি পায়।।

কৈবল্য লাভে পথ কিছু নাই আর।

একমাত্র জ্ঞানই পথ শুদ্ধ জ্ঞান সার।।

পুরাকালে দণ্ডবনে শুনিলেন রাম।

শিবমুখে গোপনীয় শিব উপাখ্যান।।

যা স্মরণে মানবের মুক্তি হয় ত্বরা।

স্কন্দ হতে শুনেছিল সনৎ কুমারেরা।।

ব্যাসদেব তাহা শুনে কুমার দ্বয় হতে।

কৃপা করি বলিলেন এই সূতপুতে।।

করি সাঙ্গ উপাখ্যান ব্যসদেব কহে।

কহিওনা তারে যে অধিকারী নহে।।

আমার বাক্যের যদি করহে অন্যথা।

দেবগণ রুষ্ট হয়ে শাপ দিবে তথা।।

অনন্তর জিজ্ঞাসিনু দেব বেদব্যাসে।

দেবগন রুষ্ট হবেন কিসের অভ্যাসে।।

কি কারনে তাহাদের হইবে কি হানি।

ক্রুদ্ধ হবে দেবগন ইচ্ছা হয় জানি।।

তাহা শুনি কহিলেন পরাশরসূত।

কারন শ্রবণ কর অতীব অদ্ভূত।।

নিত্য অগ্নিহোত্রে রত যতেক ব্রাহ্মণ।

কামধেনু রূপ মানে সর্ব দেবগণ।।

ভক্ষ্য, ভোজ্য, পেয় যা ইষ্ট পদে দান

স্বর্গে থেকে দেবগণ অগ্নি দ্বারা পান।।

ইহা ছাড়া দেবগনের অন্য পথ নাই।

অগ্নি ভুখ দেব মুখ বলা হয় তাই।।

গৃহ ছাড়ি দুগ্ধবতী অন্য কোথা গেলে।

গৃহ নিমজ্জিত হয় দুখঃ হলাহলে।।

বিপ্রগণ লভে যদি এই ব্রহ্ম জ্ঞান।

যাগ যজ্ঞ হীন হয় দেব দুখঃ পান।।

বিষয়ের বিষ ঢালি তাই দেবগণ

সদাই ব্যাস্ত রাখে মানবের মন।।

স্ত্রী-পুত্র-সংসারে মন ন্যাস্ত রয়।

জীবগনে শিব জ্ঞান কভু নাহি হয়।।

যদি বা শিব জ্ঞান কভু সমুদ্ভবে।

মধ্য পথে বিঘ্ন ফলে বিচ্ছিন্নতা লভে।।

দয়া করে যদি শিব দেন দরশন।

চিনেও না চিনে তারে অবিশ্বাসী মন।।

এতেক শুনি মুনিগন সূতেরে জিজ্ঞাসে।

পুরুষের মুক্তি সাধন হবে তবে কিসে।।

দেবগণ হন যদি তাহে অন্তরায়।

শিবজ্ঞান হবে তবে কহ কি উপায়।।

কহিলেন সূত - মুনি জানহ নিশ্চয়।

কোটি জন্ম পুন্যফলে শিবে ভক্তি হয় ।।

সকল কামনা হীন হইয়া তখন।

ইষ্ট-পূর্ত্ত সকল কর্ম করে শিবার্পণ।।

শম্ভূ অনুগ্রহে তবে দৃঢ় হয় নর।

বিঘ্ন হেতু ভয়ে ডরে যত সুরেশ্বর।।

বিঘ্ন দূরীকৃত হলে ভক্তি তৃষ্ণা জাগে।

শিব চরিত শুনি মনে বড় ভাল লাগে।।

শুনিতে শুনিতে কথা জ্ঞান উপজয়।

শিব জ্ঞান হলে পরে তবে মুক্তি হয়।।

কি কহিব কি বলিব শিবে ভক্তি অতি।

পঞ্চপাপ কোটিপাপ সকল বিমুচ্যতি।।

শিব ভক্তি সম্পন্ন অতি মূর্খ জন।

পলকেই নাশ করে সংসার বন্ধন।।

যেই জন ভক্তি করে বা করে দ্বেষ।

উভয়েরই ইচ্ছা পূরন করেন মহেশ।।

ভক্তিভরে তারে যদি দাও ফুল ও জল।

ত্রি জগত দেন তিনি হইয়া কুশল।।

ফুল-জল নাহি পাও কর নমস্কার।

অর্দ্ধ প্রদক্ষিণে তিনি হন চমৎকার।।

প্রদক্ষিণে অশক্ত হও কর চিন্তা তাহে।

সর্ব্ব অভীষ্ট সিদ্ধ হবে শিব অনুগ্রহে।।

বেলকাঠের চন্দন আর বন্য পুষ্প-ফলে।

যে জন প্রীত হয় ভক্তি সহ দিলে।।

তার সেবা করা বল কি আর দুষ্কর।

কিছু না পাহিলে তবে হাত জোড় কর।।

বন্য দ্রব্যে তিনি হন যাদৃশী খুশী।

গ্রাম্য দ্রব্যে উত্তম দ্রব্যে না হন তাদৃশী।।

সুখলভ্য শম্ভূ ছাড়ি যে পূজে অন্য নাম।

ভাগীরথী ছাড়ি সে মৃগতৃষ্ণিকাম্‌।।

ইতি জ্ঞান-সঙ্কলিণী তন্ত্র

523995_622503017793741_964853878_n
দেবী বললেন – হে দেব শক্তি কে? এবং শিব কে? তা আগে আমাকে বলুন তারপর জ্ঞানের বিষয়ে বলবেন।
মহাদেব বললেন – হে দেবী চিত্ত যখন অস্থির তখন তাতে শক্তি অবস্থান করেন এবং চিত্ত যখন স্থির হয় তখন তাতে শিব অবস্থান করেন। চিত্ত স্থির হলে জীব দেহ ধারণ করেই সিদ্ধি বা মোক্ষ লাভ করে থাকে।
দেবী জিজ্ঞেস করলেন – শরীরের কোন স্থানে তিন প্রকারের শক্তি , ছয় প্রকারের চক্র, একুশ টি ব্রহ্মাণ্ড ও সাত প্রকারের পাতাল অবস্থিত আছে তা আমাকে বলুন।
মহাদেব বললেন- উর্দ্ধশক্তি কণ্ঠে, অধোশক্তি গুহ্যদেশে এবং মধ্য-শক্তি নাভিতে অবস্থিত। আর যিনি এই তিন শক্তির বাইরে তাকেই নিরঞ্জন ব্রহ্ম বলে। গুহ্য চক্রকে আধার, লিঙ্গ-চক্রকে স্বাধিষ্ঠান, নাভি-চক্রকে মনিপুর, হৃদয়-চক্রকে অনাহত, কণ্ঠ-চক্রকে বিশুদ্ধ এবং মস্তক-চক্রকে সহস্রদল বলে। যিনি এই ছয় চক্রকে ভেদ করতে পারেন তিনি চক্রাতীত ও নমস্য ব্যক্তি। শরীরের উর্দ্ধ দিক হল ব্রহ্মলোক। এবং শরীরের নীচের দিক হল পাতাল লোক। এই শরীর বৃক্ষের মত কিন্তু এর উর্দ্ধদিক হল সেই বৃক্ষের মূল স্বরূপ এবং নিম্নদিক হল সেই বৃক্ষের শাখা স্বরূপ।
দেবী বললেন – হে শিব, হে শঙ্কর, হে ঈশান, হে পরমেশ্বর আমাকে বলুন এই দেহের মধ্যে কি ভাবে দশ প্রকার বায়ু অবস্থিত এবং যে দশটি দরজা আছে সেগুলি কি কি ?
মহাদেব বললেন – হৃদয়ে প্রাণবায়ু, গুহ্যদেশে অপাণবায়ু, নাভিদেশে সমান বায়ু, কণ্ঠে উদানবায়ু, দেহের ত্বকে ও সারা দেহ জুড়ে ব্যান বায়ু অবস্থিত। নাগ বায়ু উর্দ্ধপান হতে আগত এবং কূর্ম্মবায়ু তীর্থ দেশে আশ্রিত।  কৃকর বায়ু মানসিক ক্ষোভে, দেবদত্ত বায়ু হাই তুললে এবং ধনঞ্জয় বায়ু গভীর চিৎকার করলে নিবেশিত হয়ে সাম্য রক্ষা করে। এই দশ প্রকার বায়ু নিরালম্ব (অবলম্বন শূন্য) এবং যোগীগণের যোগ সম্মত।  আমাদের শরীরের নবদ্বার প্রত্যক্ষ করা যায় এগুলি হল দুটি চোখ, দুটি কান, দুটি নাসারন্ধ্র, মুখ, গুহ্য ও লিঙ্গ এবং দশম দ্বার হল মন।
দেবী বললেন – সারা শরীর জুড়ে যে নাড়ী অবস্থিত তা কয় ভাগে বিভক্ত? কুণ্ডলিনী শক্তি ও তা থেকে উৎপন্ন যে দশটি নাড়ী সে সম্বন্ধে আমাকে বলুন।
মহাদেব বললেন – ঈড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না এই তিনটি নাড়ী উর্দ্ধগামিনী; গান্ধারী, হস্তি জিহ্বা ও প্রসবা এই তিনটি নাড়ী দেহের সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত আছে। শরীরের দক্ষিণ অঙ্গে অলম্বুষা ও যশা এই দুটি ও বাম অঙ্গে কুহু ও শঙ্খিনী এই দুটি নাড়ী ব্যবস্থিত। এই দশ প্রকার নাড়ী হতেই শরীরে নানা নাড়ী উৎপন্ন হয়েছে এবং বাহাত্তর হাজার প্রসূতিকা নাড়ী শরীরের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়।  যে যোগী এই সমস্ত নাড়ী গুলিকে জানেন তিনি যোগ লক্ষণ যুক্ত হয়ে যান এবং জ্ঞাননাড়ী হতেই যোগীগণ সিদ্ধিলাভ করে থাকেন।
দেবী বললেন – হে ভূতনাথ, হে মহাদেব, হে পরমেশ্বর তিন দেবতার সম্বন্ধে আমাকে বলুন তদের তিন প্রকার গুণ ও ভাব কি কি?
মহাদেব বললেন – রজো ভাবে ব্রহ্মা, সত্ত্ব ভাবে বিষ্ণু ও ক্রোধ ভাবে রুদ্র অবস্থিত আছেন। এই হল তিন দেবতা, এই হল তিন প্রকার গুণ। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই তিন দেবতার মূর্ত্তি একই, যার মনে এই তিন দেবতার পৃথক পৃথক ভাব পরিকল্পিত হয় তার মুক্তি কখনোই হয় না।  দেহের মধ্যে ব্রহ্মা বীর্য্যরূপে, বিষ্ণু বায়ু রূপে ও রুদ্র মন রূপে অবস্থিত আছেন, এই তিন দেবতা ও এই তিন গুণ। দয়া ভাবে ব্রহ্মা, শুদ্ধ ভাবে বিষ্ণু ও অগ্নি ভাবে রুদ্র অবস্থান করে এই তিন দেবতা, এই তিন গুন। এই জগৎ চরাচর সকল কিছুই সেই সেই এক পরমব্রহ্ম থেকেই উৎপন্ন হয়েছে, যার মধ্যে এই জগৎ সম্বন্ধে নানা ভাবের সৃষ্টি হয় তার মুক্তি কখনই হয় না। আমিই সৃষ্টি, আমিই সময়, আমি ব্রহ্মা, আমি হরি, আমি রুদ্র, আমি শূন্য, আমি সর্বব্যাপী ও আমিই নিরঞ্জন ব্রহ্ম। আমি সর্বময়, আমি নিষ্কাম, আমার উপমা আকাশ, শুদ্ধ স্বভাব ও নির্ম্মল ব্রহ্ম স্বরূপ মনও আমি, এর মধ্যে কোন সংশয় নেই। যে বীর জিতেন্দ্রিয়, ব্রহ্মচারী, সুপণ্ডিত, সত্যবাদী, দানশীল, অন্য ব্যাক্তির হিতে রত (পরোপকারী) তাকেই ভক্ত বলে। ব্রহ্মচর্য তপস্যার মূল এবং দয়া ধর্মের মূল তাই যত্ন সহকারে দয়া ও ব্রহ্মচর্যের আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত।
দেবী বললেন – হে যোগেশ্বর, হে জগন্নাথ, হে উমাপ্রাণবল্লভ, বেদ, সন্ধ্যা, তপস্যা, ধ্যান, হোম, কর্ম ও কুল কি তা আমাকে বলুন?
মহাদেব বললেন – হাজার অশ্বমেধ যজ্ঞ বা একশ বাজপেয় যজ্ঞের যে পুণ্যফল তা ব্রহ্মজ্ঞানের পুণ্যফলের ষোলকলার এক কলারও সমান নয়। সব সময়ে শুচি হয়ে সকল পুণ্যতীর্থে ভ্রমণ করে যে পুণ্যফল তা ব্রহ্মজ্ঞানের পুণ্যফলের ষোলকলার এক কলারও সমান নয়। না বন্ধু, না পুত্র, না পিতা, না সখা, না স্বামী কাউকেই সেই গুরুর সাথে তুলনা করা যায় না যে সেই পরম পদ দেখিয়ে দিতে পারেন। না বিদ্যা, না তীর্থ, না দেবতা কেউ সেই গুরুর সাথে তুলনীয় নয় যে সেই পরম পদ দেখিয়ে দিতে পারেন। এবং সেই পরম পদ পাওয়ার জন্য গুরু শিষ্যকে যে একাক্ষর মন্ত্র নিবেদন করেন সারা পৃথিবীতে এমন কোন দ্রব্যই নেই যার দ্বারা গুরুর সেই ঋণ শিষ্য শোধ করতে পারে। যাকে তাকে এই সুগোপনীয় ব্রহ্মজ্ঞান দেওয়া যায় না কেবলমাত্র সদগুরু(?) তার যে কোন ভক্ত শিষ্যকেই এই ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করবেন। জ্ঞানী মাত্রেই মন্ত্র, পূজা, তপ, ধ্যান, হোম, জপ, বলিক্রিয়া ও সন্ন্যাস আদি সকল প্রকার লৌকিক কাজ পরিত্যাগ করবেন। সংসর্গেই (সঙ্গগুণ) সকল প্রকার দোষ ও নিঃসঙ্গ(একাকী) থাকলেই সকল প্রকার গুণের উৎপত্তি হয়ে থাকে তাই সব রকমের চেষ্টা দ্বারা সব রকমের সঙ্গ পরিত্যাগ করবে। অকার সত্ত্বগুণ, উকার রজোগুণ এবং মকার তমোগুণ এই তিন গুনের আধারই প্রকৃতি। অক্ষরই প্রকৃতি এবং অক্ষরই স্বয়ং ঈশ্বর (পুরুষ)। প্রকৃতি এই পুরুষ থেকেই এসেছেন এবং সত্ত্ব, রজ:, তম: এই তিন গুনের দ্বারা বদ্ধ হয়েছেন। সেই মায়া স্বরূপ প্রকৃতি পালন, সৃষ্টি, সংহার এই তিন শক্তিবিশিষ্ট এবং সেই মায়াই অবিদ্যা, মোহিনী, শব্দরূপা ও যশস্বিনী হয়েছেন।  অকার ঋকবেদ, উকার যজুর্বেদ ও মকার সাম বেদ এই তিনটি মিলিত হয়েই অথর্ব্ববেদ হয়েছে। ওঁকার প্লুত স্বর এবং একে ত্রিনাদও বলা হয়ে থাকে। অকার ভূলোক, উকার ভুবর্লোক ও  ব্যঞ্জন সহ মকার স্বর্গলোক এবং এই তিন অক্ষরেই আত্মা বিশেষ ভাবে অবস্থিত থাকে। অকার পৃথিবী এবং হলুদ বর্ণের। উকার অন্তরীক্ষ এবং বিদ্যুৎ বর্ণ সংযুক্ত এবং মকার স্বর্গ এবং শুক্ল বর্ণ সংযুক্ত। এবং এই সকল বর্ণ সংযুক্ত একাক্ষর প্রণব ওঁকারই একমাত্র নিশ্চিত ব্রহ্ম। আসন করে এবং চিন্তাশূন্য ভাবে প্রতিদিন বসবে কিন্তু খেয়াল রাখবে ঘুমিয়ে না পড় এই ভাবে প্রতিদিন বসলেই যোগী হওয়া যায় এটাই শিবের কথা এর অন্যথা নেই।  যে ব্যাক্তি প্রতিদিন এই ব্রহ্মজ্ঞানের কথা পাঠ বা শ্রবণ করে সে ব্যাক্তি সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত হয়ে বিশুদ্ধ আত্মা হয়ে শিবলোক প্রাপ্ত হয়।
দেবী বললেন – স্থূল লক্ষণ কি, কি ভাবে মনের বিলয় ঘটে থাকে স্থূল ও সূক্ষ্মের লক্ষণ স্বরূপ যে পরমার্থ নির্বাণ তা কি?
মহাদেব বললেন- যখন জ্ঞান হয় তখন অন্ধকার স্বরূপ পাপ আর বিদ্যমান থাকে না। তখনই মনের বিলয় ঘটে থাকে।  এবং যখন জ্ঞান জন্মায় তখন পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ এই পঞ্চভূত হতে সৃষ্ট যে দেহ তা স্থুলরূপে অবস্থিত করে আর জ্ঞান লাভ করলে এর যে অন্যথা অবস্থান তাই সূক্ষ্মরূপে অবস্থিত থাকে।
-       ইতি জ্ঞান-সঙ্কলিণী তন্ত্র (শ্লোক -৬৩-১১০)
lord-lakulish-lingum-yoni

Saturday, November 23, 2013

জ্ঞান সঙ্কলিণী তন্ত্র (ভাগ ৪)


দেবী বললেন- জীব কিভাবে শিবে পরিণত হয়? শিবের সেই প্রসন্নতার কার্য্য-কারন আমাকে বলুন। তখন মহাদেব বললেন- জীব ভ্রান্তিতে বদ্ধ থাকলেই জীব থাকে যখনই ভ্রান্তিমুক্ত হয়ে যায় তখন সে সদাশিবে পরিণত হয়।  তুমিই কার্য্য এবং তুমিই কারন এবং তোমার অন্তরের ভাবের জন্য তুমি এই কার্য্য ও কারণ কে বিশেষ ভাবে বোধ হয়। মন অন্যত্র, শিব অন্যত্র, শক্তি অন্যত্র, বায়ু অন্যত্র এই ভেবে এই তীর্থ সেই তীর্থ করে তামসিক জনেরাই ভ্রমন করে থাকে। হে প্রসন্ন চক্ষুধারী দেবী আত্মতীর্থ জ্ঞানহীন ব্যাক্তির মুক্তি কিভাবে সম্ভবপর হবে। বেদকে বেদ বলা যায় না, বেদ বলা যায় নিত্য সনাতন ব্রহ্মকে। যিনি সর্ব্বদা সর্ব্বত্র ব্রহ্মজ্ঞানে রত তিনিই যথার্থ ব্রাহ্মণ ও বেদজ্ঞ। যোগীগন চারি বেদ পাঠ করে ও সর্বশাস্ত্র মন্থন করে এর সার বস্তু পান করেছেন আর পণ্ডিত গন ঘোল পান করেছেন। সকল প্রকার শাস্ত্রই উচ্ছিষ্ট হয়েছে এবং সকল প্রকার বিদ্যাই মুখে মুখে রয়েছে কিন্তু সেই অব্যক্ত চেতনাময় ব্রহ্মজ্ঞান কখনোই উচ্ছিষ্ট হয়  নি। কারন ভাষা দিয়ে একে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।  ব্রহ্মচর্য্য ছাড়া আর কোন উত্তম তপস্যা নেই। যে ব্যাক্তি উর্দ্ধরেতা সে দেবতা মানুষ নয়। শুন্যের (নিরাকারের) ধ্যান ছাড়া আর কোন প্রকার ধ্যানই উত্তম নয়। এবং ধ্যান শুন্য কে অবলম্বন করলে তার প্রসাদে সুখ ও মোক্ষ এই দুইই লাভ হয়ে থাকে সে বিষয়ে কোন সংশয় নেই। সেই হোমের থেকে কোন বড় হোম নেই যেই হোমে ব্রহ্মাগ্নিতে প্রানরূপ ঘৃতের দ্বারা আহুতি প্রদান করা হয়। যজ্ঞহেতু যে হোম করা হয় তা হোমই নয়। পাপকর্ম্ম যা হওয়ার তা হবে এবং পুণ্যও প্রর্বত্ত হতে থাকবে এর জন্যই যারা বুদ্ধিমান তারা এই দুটিকেই সর্ব প্রযত্ন সহকারে পরিহার করে থাকেন।  যতক্ষন মানুষের মধ্যে বর্ণ কুল ইত্যাদি জ্ঞান থাকে ততক্ষণ মানুষের জ্ঞান জন্মায় না। মানুষের ব্রহ্মজ্ঞান যখনই হয়ে তখনই সব বর্ণ ও কুল বিবর্জন হয়ে যায়।
দেবী বললেন- আপনি জ্ঞানের যে বিশ্লেষণ করলেন তা আমার বোধগম্য হল না। হে শঙ্কর , হে দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যে জ্ঞানে মন একেবারে তন্ময় হয়ে যায় তা দয়া করে আমাকে বলুন।

মহাদেব বললেন- মন, বাক্য এবং কর্ম এই তিনটিই যখন লয় প্রাপ্ত হয় ও স্বপ্নবিহীন নিদ্রা যেমন সেই রকম কোন অবলম্বন ব্যতিরেকে যে জ্ঞান জন্মায় তাকেই ব্রহ্মজ্ঞান বলে। যে জ্ঞান দ্বারা মানুষ একাকী, স্পৃহাহীন, শান্ত, চিন্তাবিহীন, নিদ্রাবিরহিত ও বালকের মত ভাবসম্পন্ন হয় তাকেই ব্রহ্মজ্ঞান বলা হয়ে থাকে। এই অর্দ্ধশ্লোকের দ্বারা আমি তোমাকে বলছি যা তত্ত্বদর্শী মহাশয়েরা যোগ বিষয়ে বলেছেন তা হল সকল প্রকার বাইরের চিন্তা পরিত্যাগ করে চিন্তাশুন্য হলেই যোগ হয়। যে ব্যক্তি নিমেষ বা অর্দ্ধনিমেষ মাত্র সমাধি প্রাপ্ত হতে পারেন তার তৎক্ষনাৎ শত জন্মের পাপ নাশ হয়ে থাকে। (শ্লোক ৪৬-৬২)

Monday, November 18, 2013

জ্ঞান সঙ্কলিণী তন্ত্র -ভাগ ৩

দেবী বললেন- হে আদিনাথ সাত প্রকার ধাতু কি কি? আত্মা, অন্তরাত্মা এবং পরমাত্মাই বা কি তা আমাকে বলুন?

মহাদেব বললেন- শুক্র (বীর্য্য), শোণিত (রক্ত), মজ্জা, মেদ (চর্বি), মাংস এই পাঁচটি এবং অস্থি (হাড়) ও ত্বক এই সাত প্রকার ধাতু প্রত্যেক শরীরে অবস্থিত আছে। এই শরীরই আত্মা, মন হল অন্তরাত্মা এবং পরমাত্মা হল শূন্য যেখানে মন বিলীন হয়ে যায়। রক্তধাতু হল মাতা, শুক্রধাতু হল পিতা প্রাণ হল শুন্যধাতু এই শুক্র ও শোণিতের মিলনেই প্রাণ সমন্বিত গর্ভপিন্ড উৎপন্ন হয়ে থাকে। দেবী বললেন – কিভাবে বাক্যের উৎপত্তি হয় এবং কিভাবে বাক্যের লয়প্রাপ্তি ঘটে থাকে? বাক্য কিভাবে আমরা নির্ধারিত করতে পারি এবং আমাকে সেই বাক্যজ্ঞান উদাহরন সহকারে ব্যাখা করে বুঝিয়ে দিন। মহাদেব বললেন- অব্যক্ত হতে প্রান সৃষ্টি হয়, প্রাণ হতে মনের এবং মানস হতে বাক্যের সৃষ্টি হয় এবং মনেই বাক্য বিলীন হয়ে যায়। দেবী বললেন- দেহের কোন স্থানে সূর্যের অবস্থান, কোন স্থানে চন্দ্রের অবস্থান, কোন স্থানে বায়ুর অবস্থান এবং কোন স্থানেই বা মনের অবস্থান তা আমাকে বলুন? মহাদেব বললেন – তালুমুলে চন্দ্রের অবস্থান, নাভিমুলে সূর্য্যের অবস্থান। এবং সূর্যের অগ্রভাগে বায়ু ও চন্দ্রের অগ্রভাগে মনের অবস্থান। হে মহাদেবি সূর্য্যের অগ্রভাগে চিত্তের এবং চন্দ্রের অগ্রভাগে প্রাণের এই অবস্থান সম্বন্ধীয় যুক্তি গুরুর উপদেশ ক্রমে লাভ হয়ে থাকে। দেবী বললেন- দেহের কোন স্থানে শক্তির  অবস্থান, কোন স্থানে শিবের অবস্থান, কোন স্থানে কাল অবস্থান করেন? দেহের মধ্যে জরার কিভাবে ও কেন উৎপত্তি হয়ে থাকে তা আমাকে বলুন। মহাদেব বললেন- পাতালে শক্তি, ব্রহ্মাণ্ডে শিব ও অন্তরীক্ষে কালের অবস্থান এবং এই কাল হতেই জরার উৎপত্তি হয়ে থাকে। দেবী বললেন- আহার কে আকাঙ্খা করে, কে পান ভোজনে তৃপ্ত হয়? কার বুদ্ধিই বা জাগ্রত, স্বপ্ন বা নিদ্রিত অবস্থায় ক্রিয়াশীল থাকে? মহাদেব বললেন- প্রান আহারের আকাঙ্খা করে। অগ্নি পান-ভোজনের দ্বারা তৃপ্ত হয় আর বায়ু জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্ত অবস্থায় প্রতিবুদ্ধ থাকে। দেবী তখন জিজ্ঞেস করলেন – হে মহাদেব কর্ম কে করে? কেইবা পাপে লিপ্ত হয়? কে পাপকার্য্য সম্পাদন করে এবং কেইবা সে পাপ হতে মুক্তি লাভ করে থাকে? মহাদেব বললেন- মনই পাপ করে, মনই পাপে লিপ্ত হয়ে থাকে এবং সেই মনই যখন উণ্মনা(মুক্ত) হয় তখন আর তার পাপ পুণ্য থাকে না। (শ্লোক-৩১-৪৫)

Thursday, November 14, 2013

জ্ঞান সঙ্কলিণী তন্ত্র (ভাগ ২)


মহাদেব তখন বললেন- ত্রিদন্ডী (তিলকধারী) মাত্রেই ভক্ত ও সর্বদা বেদ চর্চা করে থাকে। যারা শাক্ত তারা প্রকৃতিবাদী অর্থাৎ প্রকৃতিই শ্রেষ্ঠ এই মতবাদ প্রমাণ করেন। আর যারা শুন্যবাদী অর্থাৎ বেদ-বেদান্ত ইত্যাদি প্রমানে বিশ্বাস করেন না তারা বৌদ্ধ। এই সব মতবাদের উপরে যারা তারাই প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞ, কিন্তু যারা চার্বাক তারা এই সকল কিছু মানেন না এবং তারা যে সকল আলোচনা করে থাকেন সেই সমস্তকিছুই বিষয় নির্ভর।
দেবী বললেন- হে দেব উমা আপনার কাছে জানতে চায় এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের লক্ষণ কি? পঞ্চভূতই বা কি কি এবং পঁচিশ প্রকার গুণই বা কাকে বলে দয়া করে বলুন।

ঈশ্বর বললেন- ব্রহ্মজ্ঞানে অস্থি, মাংস, নখ, ত্বক ও লোম এই পাঁচটি পৃথিবীর গুন বলে বর্নিত হয়েছে। শুক্র, শোণিত, মজ্জা, মল, মুত্র এই পাঁচটি জলের গুণ বলে বর্নিত হয়েছে। নিদ্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও আলস্য এই পাঁচটি অগ্নির গুণ বলে বর্নিত হয়েছে। ধারণ, চালন, ক্ষেপণ, প্রসারণ ও সঙ্কোচণ এই পাঁচটি বায়ুর গুণ বলে বর্নিত হয়েছে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও লজ্জা এই পাঁচটি আকাশের গুণ বলে বর্ণিত হয়েছে। আকাশ হতে বায়ু, বায়ু হতে সূর্য(তেজ), সূর্য হতে জল এবং জল হতে পৃথিবীর উৎপত্তি হয়ে থাকে। এই পৃথিবী জলে বিলীন হয়, জল সূর্যে বিলীন হয়, সূর্য বায়ুতে এবং বায়ু আকাশে লীন হয়ে থাকে। এই পাঁচ প্রকার তত্ত্ব হতেই সৃষ্টি হয় এবং এই পঞ্চতত্ত্বেই সকল তত্ত্ব লয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে। এই পঞ্চবিধ তত্ত্বের পরে যে তত্ত্ব তাকেই বলে তত্ত্বাতীত বা নিরঞ্জন। স্পর্শন, রসন, ঘ্রাণ, দর্শন এবং শ্রবণ এই পাঁচটি কর্মই ইন্দ্রিয়ের পঞ্চতত্ত্ব আর এই সকল ইন্দ্রিয়ের কর্ম পরিচালিত করে মন(প্রধান)। এই ব্রহ্মাণ্ডের সকল প্রকার লক্ষণ আমাদের এই দেহের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। এর মধ্যে যেগুলি সাকার সেই গুলির বিণাশ হয় এবং যেগুলি নিরাকার (আকার শুন্য) সেগুলি অবিনাশী।(সাকারাশ্চ বিনশ্যন্তি নিরাকারো ন নশ্যতে)। যার মন নিরাকার সে নিরাকারসম হয়ে যায় আর নিরাকারের বিনাশ নাই তাই সর্ব প্রকার প্রচেষ্টা করে সাকার চিন্তা পরিত্যাগ কর। (শ্লোক ১৭-৩১) 
  

Wednesday, October 23, 2013

জ্ঞান সঙ্কলিণী তন্ত্র- (ভাগ ১)

কৈলাস শিখরে পদ্মাসনে বসে আছেন দেবতাদের দেবতা, জগতের গুরু মহাদেব। মহাদেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, - হে মহান ঈশ্বর, জ্ঞান কাকে বলে? আমাকে বলুন। কি ভাবে এই সৃষ্টির উদ্ভব হল? কি ভাবেই বা এর বিনাশ হয়ে থাকে? সেই ব্রহ্মজ্ঞানই বা কি যা এই সৃষ্টি সংহার বর্জিত?
ঈশ্বর বললেন- একমাত্র অব্যক্ত (যা বাক দ্বারা প্রকাশ করা যায় না) হতেই সৃষ্টি হয় এবং সেই অব্যক্তের মধ্যেই সব লীন হয়। সৃষ্টি-সংহার হীন যে ব্রহ্ম জ্ঞানের কথা বলছ তা ওই অব্যক্তই। ওঁ কার থেকেই চৌদ্দটি বিদ্যা, মন্ত্র, পূজা, তপ:, ধ্যান, কর্ম, অকর্ম ইত্যাদি সমস্ত কিছু নির্গত হয়েছে। চারটি বেদ, ছয়টি বেদাঙ্গ, মীমাংসা, ন্যায়, ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ এই চৌদ্দটিকেই চতুর্দশ বিদ্যা বলা হয়ে থাকে। এই চৌদ্দটি বিদ্যাকে সম্পূর্ণভাবে করায়ত্ত করতে পারলেই জ্ঞান লাভ হয়। এবং এই জ্ঞান লাভ হলেই ব্রহ্ম জ্ঞানে অধিকার জন্মায়। আর ব্রহ্ম জ্ঞান যার হয় তার সকল বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞান হয়।
বেদ-পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রগুলিকে নগর বধূর (পতিতা) মত সকলের কাছেই প্রকাশ করা যায় কিন্তু শাম্ভবী বিদ্যা অভ্যন্তরীণ বিদ্যা এবং কুল বধূর তুল্য সদা অপ্রকাশ্য (দেখানো চলে না বা দেখানো যায় না)। দেহের মধ্যেই সমস্ত বিদ্যা থাকে, দেহের মধ্যেই সকল দেবতারা স্থিত থাকেন, দেহের মধ্যেই সকল তীর্থের অবস্থান এবং গুরু আশীর্বাদে তা প্রত্যক্ষ করা সম্ভব, অনুভব করা সম্ভব। আধ্যাত্মবিদ্যা মানুষকে সুখ ও মোক্ষ প্রদানকারী বিদ্যা এবং এই বিদ্যা লাভ করলে ধর্ম, কর্ম, জপ ইত্যাদির নিবৃত্তি হয়ে থাকে। কাঠের মধ্যে যেভাবে আগুন থাকে, ফুলের মধ্যে যেভাবে গন্ধ থাকে এবং জলের মধ্যে যেভাবে অমৃত সকল সময়ই বিদ্যমান থাকে দেহের মধ্যে সেইভাবেই দেবতা পাপ-পুণ্য বিবর্জিত হয়ে সদা উপস্থিত থাকেন। (১-১০)

দেহের মধ্যে তিনটি নাড়ী থাকে। (তিন প্রকার) তার মধ্যে ঈড়া হল ভগবতী (যে ভগ বহন করে) গঙ্গা, পিঙ্গলা হল যমুনা নদী এবং সুষুণ্মা হল সরস্বতী নদী। (এখানে ঈড়া হল ধমনী যার মধ্যে শুদ্ধ শোণিত প্রবাহিত হয়, পিঙ্গলা হল শিরা যার মধ্যে দূষিত রক্ত বাহিত হয় পুনরায় শুদ্ধি করণের জন্য এবং সুষুণ্মা হল স্নায়ু তন্ত্র যার মাধ্যমে আমাদের উত্তেজনা (impulse)প্রবাহিত হয় যা অনুভূতির উদ্ভব ঘটায়, জ্ঞান হিসাবে সঞ্চিত থাকে বা বাক হিসাবে প্রকাশিত হয়ে যুগ যুগান্ত প্রবাহিত হয় তাই একে বলা হয়েছে সরস্বতী।)
যেখানে এই তিনটি নদী মিলিত হয় তাকে বলা হয় ত্রিবেণী সংগম, যা সমস্ত তীর্থের শ্রেষ্ঠ, তেমনি এই তিন প্রকার নাড়ী যেখানে মিলিত হয় তাকেও ত্রিবেণী বলা হয়ে থাকে। ত্রিবেণী সংগমে স্নান বা অবগাহন করতে পারলে যেমন সকল প্রকার পাপ দূর হয়ে থাকে তেমনি শরীর অভ্যন্তরস্থ ত্রিবেণী সংগমে অবগাহন করতে পারলে মনের অন্ধকার দূর হয়ে মানুষ শুদ্ধ চৈতন্যের অধিকারী হয়। (এই জন্যই কি বলে- ‘ডুব দেরে মা কালী বলে’। শরীর অভ্যন্তরস্থ ত্রিবেণী সংগম হল মানস লোক বা মন, স্নান অর্থে অবগাহন অর্থাৎ মনকে বিশেষ ভাবে জানতে পারলেই অজ্ঞানতা বা পাপ বিদূরিত হয়।)
দেবী জিজ্ঞেস করলেন- খেচরী মুদ্রা কি প্রকার? শাম্ভবী বিদ্যা কি? আধ্যাত্মবিদ্যাই বা কি হে মহেশ্বর তা আমাকে বলুন।
মহাদেব বললেন- বিনা অবলম্বনে যখন মন স্থির থাকে (মন সর্বদাই মনন করে থাকে, অর্থাৎ কিছু না কিছু চিন্তা তরঙ্গ উৎপন্ন করেই চলে এবং তার জন্য মনের প্রয়োজন হয় বিষয়ের অবলম্বন কিন্তু মন যখন বিষয় চিন্তা পরিত্যাগ করে তখন তার তরঙ্গ বা আন্দোলন বন্ধ হয় এবং তখনই মন স্থির হয়েছে বলে ধরা সঠিক), বিনা প্রতিরোধে যখন বায়ু স্থির থাকে (বায়ু বলতে এখানে শরীর অভ্যন্তরস্থ বায়ু সমূহের কথা বলা হয়েছে। প্রাণায়ামের সঠিক অভ্যাসে যখন আর মুদ্রা সহযোগে আঙুলের সাহায্যে নাসিকা নিরুদ্ধ করে বায়ুর গতিকে সমাহিত করার প্রয়োজন হয় না তখন বায়ু সকলকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় আর মন স্থির হলেই এটা সম্ভব বা এটা হলেই মন স্থির হয়ে থাকে)এবং দৃষ্টি যখন বিনা অবলোকনেই স্থির করা যায় তখন সেই টিকে খেচরী মুদ্রা বলা হয়ে থাকে।
বালক ও মূর্খের চেতনা যেমন স্বপ্ন হীন হয়েও নিদ্রিত হতে পারে সেই রকম যে বিদ্যা দ্বারা কোন অবলম্বন ছাড়াই আধ্যাত্মপথে অগ্রসর হওয়া যায় তাকেই শাম্ভবী বিদ্যা বলে।
দেবী তখন বললেন- হে দেবতাদের দেবতা, জগতের প্রভু জগন্নাথ পরমেশ্বর, কি জন্য এই দর্শন শাস্ত্র গুলি এ রকম ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে তা আমাকে বলুন? (খুবই স্বাভাবিক প্রশ্ন। এক ঈশ্বরের ভজনা করার জন্য এত ভিন্ন ভিন্ন মত ও পথ কেন?) (শ্লোক ১-১৬)
 

Nataraja


Nataraj
Nataraja

Tantrik

Tantrik
Tantrik

Yabyum

Yabyum
Yabyum